শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ০২:৫৬ অপরাহ্ন

শিরোনাম :
বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণে টিডিএসে খোলা হয়েছে শোক বই বেগম জিয়ার আত্মার মাগফেরাত কামনায় ট্রাফিক স্কুলে দোয়া মাহফিল স্কুল অব লিডারশিপ এর আয়োজনে দিনব্যাপী পলিটিক্যাল লিডারশিপ ট্রেনিং এন্ড ওয়ার্কশপ চাঁদপুরে সাহিত্য সন্ধ্যা ও বিশ্ববাঙালি মৈত্রী সম্মাননা-২০২৫ অনুষ্ঠিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় টিডিএসে দোয়া মাহফিল সব্যসাচী লেখক, বিজ্ঞান কবি হাসনাইন সাজ্জাদী: সিলেট থেকে বিশ্ব সাহিত্যে কসবায় বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের পক্ষে নেতাকর্মীদের গণসংযোগ ও লিফলেট বিতরন ৭ই নভেম্বর: সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান এখন কবি আল মাহমুদের সময় দৈনিক ঐশী বাংলা’র জাতীয় সাহিত্য সম্মেলন ১৭ জানুয়ারি-‘২৬ ঢাকার বিশ্ব সাহিত্যকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত হবে
মুক্তিযোদ্ধার জ্যোস্নাস্নান

মুক্তিযোদ্ধার জ্যোস্নাস্নান

আফরোজা পারভীন।।

তিনটে তালগাছ যেন ত্রিভুজ রচনা করেছে। কেউ ইচ্ছা করে এমন ত্রিভুজাকৃতিতে গাছ রোপন করেনি। কোন এক সময় তাল খেয়ে কেউ বা কারা আঁটি ফেলেছিল। সেই আঁটি থেকে এই গাছ। আঁটিগুলো জোড়া দিয়ে সরলারেখা টানলে বিশালাকৃতির এক ত্রিভুজের রূপ নেয়।
গাছ তিনটে বড় একটা মাঠের মাঝামাঝি জায়গায়। হাজি সাহেব প্রকৃতিকে ভালবাসেন। বাড়ির সামনে খোলা মাঠ তার ভালো লাগে। ভালো লাগে ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা যখন মাঠ দাপিয়ে খেলে। তিনি ঘরের দাওয়ায় বসে দেখেন আর আনন্দ পান।
হাজিসাহেবের নাম আব্দুস সালাম। কিন্তু এ নাম এখন আর কেউ তেমন স্মরণ করে না। তিনি গ্রামের স্কুলের হেডমাস্টার, মসজিদ কমিটির সভাপতি। অল্পবয়সে হজ্জ করেছিলেন। যে বছর হজ্জ করলেন সেই বছর থেকেই গ্রামবাসি তাকে হাজি ডাকতে শুরু করল।
হাজি সাহেবের স্ত্রী জান্নাতুন্নেসা। দুই মেয়ে আফিয়া আর সাফিয়া। খুব সুখি হাজিসাহেব। পুত্রসন্তান নেই বলে কেউ যখন হাজির আফসোস করে হাজিসাহেব সোজা বলে দেন, সন্তান আল্লাহর দান, নিয়ামত। পুত্রসন্তান, কন্যাসন্তান সবই এক। আলহামদুলিল্লাহ।
মাথার উপর আছেন মা ফাতেমা খাতুন। হাজি তাই নিজেকে সর্বসুখি মনে করেন।
ত্রিভুজ তালগাছের নিচে বসে ক্রুসকাঁটা দিয়ে লেস বুনছিল তিন কন্যা। একজন বুনছিল উলের সোয়েটার। জোছনা রাত। সে জোছনার ধার এতটাই যে ঘাসের জমিনে বালিও দেখা যায়। বাছা যায় কালো চুলের অরণ্যে উকুন। অঢেল জোছনা ঢেলে দিয়েছে বিধাতা এই যুদ্ধ দিনে। চার কন্যার দুজন আফিয়া আর সাফিয়া। আর দুজন পলি আর উপমা। পলি আর উপমা এসেছে ঢাকা থেকে। ২৬ মার্চ রাজারবাগ পুলিশ লাইনে গুলি হবার পর দু চারখানা কাপড় নিয়েই পরিবারসহ ঢাকা ছেড়েছিল পলির বাবা ফরহাদ আর উপমার বাবা আকরাম । হাজিসাহেব উপমার দূর সম্পর্কের খালু। পলি জান্নাতুন্নেসার বোনের ননদের মেয়ে। স্বাভাবিক সময়ে কোনো যোগাযোগ ছিল না ওদের সাথে। এ ব্যাপারে হাজির যুক্তি সোজা,
: যোগাযোগ রাখা দুজনেরই কাজ। আমি কি নিছি ওদের খোঁজ খবর? নিইনিতো। বিপদে পড়েছে, এসেছে থাকবে। ওদের দায়িত্ব এখন আমার।
পলি উপমারা ছাড়াও তমিজ আর মাজেদ সাহেবের পরিবার আছে এ বাড়িতে। সব মিলে বাড়িতে অনেকগুলো বাচ্চা। সারাদিন বাচ্চাগুলো হৈ হৈ করে খেলাধুলা করে, কখনও বাড়ির ভেতরের উঠোনে, কখনো মাঠে। ওরা এখন খেলে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা। মুক্তিযোদ্ধা আর পাকিস্তানি এই দু দলে ভাগ হয়ে লাঠি সোটাকে বন্দুক বানিয়ে খেলে ওরা। বাড়ির সবাই সে খেলা দেখে। মনে মনে কামনা করে মুক্তিযোদ্ধারা যেন জেতে। পাকিস্তানিদের দলে কেউ পেতে চায় না। এখন লটারি করে। তারপরও পাকিস্তান দলের ছেলেরা মন খারাপ করে। অবধারিতভাবে মুক্তিযোদ্ধারা জেতে। ধ্বনি তোলে ‘জয়বাংলা’। জান্নাতুন্নেসা ঠোঁটের উপর আঙ্গুল রেখে বলে, ‘আস্তে আস্তে। কে কোথায় শুনবে!’
ওরা আরো জোরে বলে, ‘জয়বাংলা’। ওরা যে মুক্তিযোদ্ধা! ভয় পাবে কেন!
জান্নাতুন্নেসা ভয় পায়। দিন কয়েক আগে পাশের পাড়ার দানেশ মিয়া হাজিসাহেবকে বাজারে বলেছিল,
: হাজিসাহেব, পাকিস্তানি রাজ কায়েম রাখার জন্য কিছু তো করা লাগে।
হাজিসাহেব চুপ করে ছিলেন।
: চুপ করে আছেন যে। আপনি হাজি মানুষ, শিক্ষক, পরহেজগার, গ্রামের মাথা। আপনার তো চুপ করে থাকা চলে না।
একটু থেমে বলেছিল,
: শুনলাম আপনার বাড়িতে অনেক মানুষ এসেছে?
: ওরা আমার আত্মীয় । জানোতো ঢাকায় গুলি হয়েছে।
:আত্মীয়! তাহলে তো কিছু বলার নেই। তবে খেয়াল রাখবেন ওর মধ্যে যেন কোনো মুক্তি না থাকে।
হাজিসাহেব চিন্তিত । দানেশ শান্তিকমিটিতে যোগ দিয়েছে। কথাটা তিনি শুধু জান্নাতুন্নেসাকেই বলেছেন।
বড় বড় হাড়িতে রান্না হয়। জানাতুন্নেসার সাথে হাত লাগান অতিথি নারীরা। মনে শঙ্কা থাকলেও গল্প, আলাপ আলোচনা, হাসি ঠাট্টাও হয়। শাশুড়ি বসে বসে তদারক করেন। রান্না হবার পর সবাই উঠোনে লম্বা লাইন করে বসে খায়। সবশেষে খেতে বসেন জান্নাতুন্নেসাসহ অতিথি চার বউ। শাশুড়িকে খাইয়ে দেন আগেই। খায় আর অনাবিল হাসিতে ভেঙে পড়ে বাচ্চারা। হাজিসাহেব বসে বসে দেখেন । মানুষের পরিতৃপ্ত মুখ দেখতে তার ভালো লাগে।
এভাবেই দিন কাটে। পলি উপমা আফিয়া সাফিয়ার সাথে মিশে যায়। বন্ধুত্ব হয়ে যায় দ্রুত। দেখে মনে হয় ওদের যেন কতকালের জানাশুনা, কতকালের আত্মীয়তা। কিন্তু বন্ধুত্বের মাঝেও আফিয়া বারবার আনমনা হয়ে যায়। কেমন যেন চুপচাপ । একসময় চোখে পড়ে পলি আর উপমার। ওরা আফিয়াকে জিজ্ঞাসা করে, জানতে চায় তার কি হয়েছে। নিশ্চুপ থাকে আফিয়া। যখন চরমপত্রে শোনে, মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়ের খবর পায়, আনন্দে হাততালি দেয় ওরা। সবচেয়ে বেশি হাততালি দেয় আফিয়া। সে হাততালি যেন থামতেই চায় না। আবার যখন কোন মুক্তিযোদ্ধার মৃত্যুসংবাদ শোনে তখন ঝরঝর করে কাঁদতে থাকে।
মাসের পর মাস চলে যায়। যেদিন জোছনার ঢল নামে ওরা বাড়ির সামনের মাঠে হাত ধরাধরি করে হাঁটে। গল্প করে নানান বিষয়ে। পলি বলে,
: জানো দেশে যুদ্ধ সেজন্য মন খুব খারাপ। আমাদের কত ভাইবোন প্রতিদিন শহিদ হচ্ছে। কিন্তু যুদ্ধ আছে বলেই আমরা এখানে এসেছি। তোমাদের সাথে দেখা হলো। সাঁতার জানতাম না। শিখলাম। যুদ্ধ না হলে আর এখানে না এলে সাঁতার শেখা হতো না।
উপমা বলে,
: আমিও বাঁশ কেটে ফুলদানি বানানো, ক্রুশ কাটা বোনা, সোয়েটার বানানো শিখলাম। এখানে না এলে এসব কিছুই হতো না।
: দেশ স্বাধীন হলে তোমরা চলে যাবে একথা ভাবলেই কষ্ট হয় বলে সাফিয়া।
আফিয়া চুপ করে থাকে।
: চুপ কেন আফিয়া? দেখ দেশ স্বাধীন হলে তো আমরা চলে যাব। হয়ত আর কখনই তোমার সাথে দেখা হবে না। তবু বলবে না কেন তোমার মন খারাপ?
আফিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে,
: একজনকে জীবনের চেয়ে ভালবাসি । সে যুদ্ধে গেছে। কতদিন দেখি না তাকে।
উপমা আর পলি ওর চোখের জল মুছিয়ে দেয়। সাফিয়া বলে,
: আমি জানি। আপা জামান ভাইকে খুব ভালবাসে। জামান ভাইও আপাকে।
: তোমার আব্বা জানেন?
: জানেন। একদিন মাকে বলছিলেন ওরা এখন ছাত্র। ছাত্রজীবনে এসব কী!
আজ আর এক জোছনাঢালা রাত। ক্রুশকাটা বুনছিল ওরা মাঠে বসে। আফিয়া লাল রঙের একটা পুলোভার বুনে শেষ করেছে। সবাই বুঝেছে ওটা জামানের জন্য। এখন বুনছে জামানের জন্য কানঢাকা টুপি। উপমা আফিয়াকে বলে,
: টুপি বুনতে আর কদিন লাগবে?
: দু তিনদিন। দেখ মানুষটার শীত খুবই বেশি। বলে ওর জীবনে একটাই ঋতু, শীত। এখন এই শীতে মাঠে ময়দানে থাকছে। কেমন আছে কে জানে!
: দেশের জন্য যারা লড়ে তাদের শীত লাগে না ।
: হ্যাঁ রক্ত গরম থাকে
: কতদিন দেখি না, আর দেখব কী না কে জানে!
বলতে বলতে মুখ তুলে সামনে তাকায় আফিয়া। তাকিয়েই স্থির হয়ে যায় । কে আসছে কে! ওই মুখ, ওই চোখ, ওই দেহভঙ্গি, হাঁটা সবই যে আফিয়ার বড় চেনা। আফিয়া হাতের কাটা ফেলে ছুটতে থাকে। দৌড়ে এসে আগন্তুকের হাত ধরে,
: তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে, এই জোছনায় তুমি এসেছ!
: কাছাকাছি একটা ব্রিজ উড়াতে এসেছিলাম। ভাবলাম এক নজর তোমাকে দেখে যাই।
: ঠিক করোনি। কে কোথায় দেখে ফেলবে। আসতে কোন আঁধাররাতে। জোছনা সব সময় ভালো না আজ বুঝলাম।
ওরা তিনজন এসে পাশে দাঁড়িয়েছে।
: ভয় পেও না। তোমাদের আড়াল করে চোখ বন্ধ করছি। জোছনার আয়নায় তোমরা প্রাণভরে দুজনকে দেখ। শক্রুর সাধ্য কি তোমাদের ছোঁয়!
ভেসে আসে হাজিসাহেবের ব্যগ্র কণ্ঠ,
: ওরে নিয়ে তাড়াতাড়ি ভেতরে আয়, চারপাশে শত্রু।
জোছনার আয়নায় দুজন দুজনকে প্রাণভরে দেখে। আফিয়া আর জামানকে ঘিরে ওরা বাড়ির দিকে দ্রুত হাঁটে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাকে বরণ করার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছেন হাজিসাহেব।

এই সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




raytahost-demo
© All rights reserved © 2019
ডিজাইন ও কারিগরি সহযোগিতায়: Jp Host BD